ঢাকা | বঙ্গাব্দ

‘গুলি আর সাউন্ডগ্রেনেডের আওয়াজে এক ভয়াবহ অবস্থা’

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : May 5, 2026 ইং
‘গুলি আর সাউন্ডগ্রেনেডের আওয়াজে এক ভয়াবহ অবস্থা’ ছবির ক্যাপশন: Collected
ad728
“আমিও ছিলাম সেই মিছিলে”

২০১৩ সালের ৫ই মে। হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ। রাতে স্টে করা হবে শুনে বিকেলে রওয়ানা করলাম শাপলা চত্বরের উদ্দেশ্যে। রাস্তাঘাট বন্ধ, যানবাহন চলছে না, জায়গায় জায়গায় পুলিশের তল্লাশী। বাসা থেকে বের হয়ে হাটা ধরলাম। চিটাগাং রোড থেকে মতিঝিল। সাথে আরেফিন ভাই, নাজিম ভাইসহ আরো কয়েকজন। শানারপাড় এসে দাড়ালাম। সিদ্ধান্ত নিলাম ভাগ ভাগ করে যাবো কারণ একসাথে এতজনকে দেখলে পুলিশ ধরবে। তারপর কখনো মেইন রোড, কখনো গলি, কখনো রিক্সা, কখনো হেটে পুলিশের চোখ এড়িয়ে ইত্তেফাক মোড়ে এসে পৌছুলাম। এখানে এসে অসংখ্য লোকজনের সমাগম দেখে নিশ্চিন্ত হলাম। 

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকজন নটরডেমের গেটে আছে শুনে সেদিকে এগুলাম। এখানেই রাতে এশার নামাজ পড়েছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পিছন থেকে মুড়ি দেওয়া হচ্ছিলো, সেটা নিয়ে এসে খাওয়াদাওয়া করলাম। এখানেই গল্প করতে থাকলাম। রাতে হামলা হবে এমন কথা শুনা যাচ্ছে তখন। 

সম্ভাবনাকে সত্যি করে রাতের ২টার দিকে পুলিশ, র‍্যাব সাজোয়া যানসহ ফকিরাপুলের দিক থেকে এসে হামলা করলো আরামবাগে। মহাসমাবেশের লোকজন এখানকার রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছিলো। সেই ব্যারিকেড ভেঙে তখন রাবার বুলেট, শটগানের গুলি চলছে সমানে। স্টেজ থেকে ঘোষণা এলো, 'সবাই যার যার জায়গায় বসে পড়ুন'। ততক্ষণে একেকজন একেকদিকে ছিটকে পড়েছে। আমার সাথে আমার বন্ধু রাজ। বসে পড়লাম ইডেন মসজিদের সামনে রাস্তায়। পুলিশ, র‍্যাবের গাড়ি তখন সর্বোচ্চ ১০০ মিটার সামনে। গুলি আর সাউন্ডগ্রেনেডের আওয়াজে এক ভয়াবহ অবস্থা। আমাদের সামনে কেবল একজনকে দেখতে পেলাম। আর পেছনে আমরা দুইজন। আমাদের পেছনে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই, সবাই দৌড়ুচ্ছে। আমি রাজকে বললাম, বসে থেকে লাভ হবে না। অন্যদিকে যাই। উঠে শাপলা চত্বরের দিকে এগুলাম৷ চোখের সামনে দেখলাম কীভাবে শাপলার লোহার গ্রীল ভেঙে লোকজন পড়ে গেলো। আমরা এপাশে এসে এফবিসিসিআই এর অফিসের নীচে এসে দেখি স্টেইজ বানানো হয়েছে যে ট্রাক দিয়ে তা এলোপাথাড়িভাবে চলে মতিঝিল ত্যাগ করছে। আমি নারায়ে তাকবীর শ্লোগান ধরলাম, লোকজনকে উদ্ধুদ্ধ করার চেষ্টা করছি। পেলাম জুবায়ের কাকাকে। দুইজনে শ্লোগান ধরেও কারো ভয় সরাতে পারলাম না। ভয়, আতংকে লোকজন একেবারে নীরব হয়ে গেছে।

চলে আসলাম বঙ্গভবনের পাশের গলিতে, এমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ওখান থেকে পুরো গলিতে অসংখ্য লোক। ততক্ষণে মা, শাহ মাহফুজ ভাই আর আজহার ভাই বারবার কল দিচ্ছেন। উনারা টেনশনে আছেন। আমি সালাম দিয়ে দোয়া করতে বললাম। এই রাস্তায় পেলাম বন্ধু রাসেলকে। এরপর যা দেখলাম আর যে লড়াই চালালাম, তা রীতিমতো আনবিলিভেবল। কয়েকহাত সামনে থেকে পুলিশ গুলি করছে। একবার পুলিশ ধাওয়া দেয়, আরেকবার সবাইকে সাথে নিয়ে পুলিশকে ধাওয়া দেই। অনুপ্রেরণামূলক কথা বলি, শ্লোগান দেই, লোকজন জড়ো হয়, সাহসের সঞ্চার করে পুলিশকে ধাওয়া দেই। এভাবেই চললো কতক্ষণ জানা নেই। রীতিমতো যুদ্ধক্ষেত্র, সাউন্ড গ্রেনেডের ভয়াবহ আওয়াজে চারপাশ আতঙ্কিত। আমরা কয়েকজন শেষ পর্যন্ত লড়ে গেলাম, কিন্তু লোকজনকে আর উদ্বুদ্ধ করতে পারছি না। সবাই ক্লান্ত, শরীর একেবারে চলছে না এমন। টিয়ারশেল খেয়ে আর পেস্ট দিয়ে আমাকে আর চেনা যায় না। হাটুতে গুলির একেবারেই সামান্য আঁচড় লেগেছে। শেষমেষ প্রায় ভোরের সময় বুঝলাম, আমরা কয়েকজন বাদে আর কারো মানসিক শক্তি নাই এই লড়াই চালানোর। 

এভাবেই শেষ হলো ৫ই মে একটা ঐতিহাসিক লড়াইয়ের। পরেরদিন সিদ্দিরগঞ্জ মাদানীনগর মাদ্রাসার সামনে হলো আরেক কুরুক্ষেত্র, যা হয়তো অনেকেরই জানা নেই। 

অসংখ্য নিরীহ আলেম ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের হত্যা করেও কোন অনুশোচনার পরিবর্তে সংসদে খুনী হাসিনাসহ আওয়ামী খুনী এমপিরা ঠাট্টা-তামাশা করলেন শহীদের লাশ নিয়ে। আলেমরা নাকি গায়ে লাল রঙ মেখেছে! 

বাংলাদেশের মানুষের অভিশাপ খুনী হাসিনা আর তার ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগের উপর। সমস্ত হত্যার বিচার চাই। বিচার নিশ্চিতের মাধ্যমেই রাজনীতির আলাপ শুনতে চাই, করতে চাই।

নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
প্রথা ভেঙে শহীদ মিনারের বেদিতে দোয়া প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দ

প্রথা ভেঙে শহীদ মিনারের বেদিতে দোয়া প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দ